২২ অক্টোবর ২০২৬ , ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সালেহ উদ্দিন

গণপরিষদ নির্বাচন এবং গণভোট বিতর্ক নির্বাচনকে অনিশ্চিত করবে

আপলোড সময় : ০৮-০৮-২০২৫ ১১:১৮:৫২ পূর্বাহ্ন
গণপরিষদ নির্বাচন এবং গণভোট বিতর্ক নির্বাচনকে অনিশ্চিত করবে
সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণপরিষদ নির্বাচন এবং গণভোট আয়োজন নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই বিতর্ক সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনে গণপরিষদ নির্বাচন এবং সংসদের অনুমোদনের পূর্বে গণভোটের কোনো প্রয়োজন নেই।


আইন ও সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজন একটি জাতীয় সংসদ। এর আগে প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, যা জাতীয় সমঝোতা দলিল হিসেবে জাতির সামনে উপস্থাপিত হতে পারে। তবে, যদি সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, অথবা শাসনব্যবস্থার কাঠামো আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয় (যেমন সংসদীয় থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে রূপান্তর), তখন সংসদে পাসের পর গণভোটের প্রয়োজন হবে।

কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য নতুন করে গণপরিষদ গঠন একটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক। বরং সংসদ নির্বাচনের পর সংবিধানের আমূল পরিবর্তন সংসদে গৃহীত হয়, তবেই গণভোটের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে দেশে গণপরিষদের কোনো কাঠামো নেই। প্রশ্ন হলো—গণপরিষদ হলে তার সদস্য সংখ্যা কত হবে? কত শতাংশ ভোটে সংবিধান পাস হবে? সদস্যরা কি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবেন? যদি না পারেন, তবে ভোটারদের ইচ্ছা উপেক্ষিত হবে না কি?

সাধারণভাবে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধান সংশোধনের বিধান রয়েছে। সেক্ষেত্রে যদি গণপরিষদ ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জটিলতা তৈরি এবং নতুন এক রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে।

গণপরিষদ নির্বাচন হলে নতুন নির্বাচিত সদস্যরা পূর্বের ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। এর পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি লিখিত সমঝোতার দলিল স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত, যা ‘গণঅভ্যুত্থানের দলিল’ বা ‘জুলাই সনদ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই সনদের ভিত্তিতে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে সাধারণ আইনের অংশগুলো অধ্যাদেশ জারি করে যতদূর সম্ভব বাস্তবায়ন করা যাবে এবং পরবর্তী সংসদে তা অনুমোদন দেয়া হবে।

সংবিধানের যেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের প্রয়োজন তা পৃথকভাবে সংশোধন করতে হবে; একে কোনোভাবেই সংবিধানের চতুর্থ তফসিল বা আপেক্ষিক অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। সংবিধানে যুক্ত হলে চতুর্থ তফসিলে যুক্ত করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং চতুর্থ তফসিলে যুক্ত করলে ভবিষ্যতে এসব সংশোধনের উপর গণতান্ত্রিক বিতর্ক এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সংবিধান পুরোপুরি বাতিল করাও কোনো যুক্তিসংগত বা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নয়। যত ত্রুটিই থাকুক এই সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে এবং এর প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা জরুরি।

গণফোরাম, বামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং এমনকি বিএনপিও সংবিধান বাতিলের মতো প্রস্তাবে সহমত নয়। তাদের অবস্থান হলো—সংবিধান পুনর্লিখন নয়, বরং সংশোধন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে যুগোপযোগী সংস্কার। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ঐকমত্যের বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন হওয়া উচিত।

গণপরিষদ নির্বাচন আরেকটি কারণে অপ্রয়োজনীয়। ১৯৭২ সালের গণপরিষদ যেমন স্বাধীনতা-উত্তর সংবিধান রচনার জন্য গঠিত হয়েছিল, তেমনি বর্তমানে ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আলোচনার ভিত্তিতে সংস্কারের প্রস্তাব প্রণয়ন করেছে।

১৯৭২ সালের গণপরিষদ মোট ১০৩টি বৈঠক করেছিল এবং সংবিধান প্রণয়নের কাজে প্রায় ২৮৯ ঘণ্টা বিতর্ক হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে অতীতের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ঐকমত্যের বাস্তবায়ন করাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও সময়োপযোগী।

আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদীয় কাঠামো থাকলে নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য গণপরিষদ প্রয়োজন হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা একই সংবিধান কাঠামোর ভেতরে থাকি, ততক্ষণ গণপরিষদের কোনো প্রয়োজন নেই। পরিবর্তনের জন্য আমাদের হাতে যথেষ্ট সাংবিধানিক যন্ত্র রয়েছে। এছাড়া গণপরিষদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী রাজনৈতিক ঐকমত্য। জনগণের প্রতিনিধিত্ব সংসদেই হয়। তাই নতুন কোনো আইন বা সংস্কার বাস্তবায়নে সংসদই যথেষ্ট।গণ পরিষদের যা কাজ তা ইতিমধ্যে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো উন্মুক্ত বিতর্কের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করেছে ।

সবমিলিয়ে বলা যায়, গণপরিষদ নির্বাচন নয়, রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল ও অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশসমূহ কার্যকর করা যেতে পারে। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সমুন্নত থাকবে এবং জাতীয় সংহতিও অটুট থাকবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৭২ সালে গণপরিষদ আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে গঠিত একটি সাংবিধানিক সভা ছিলো। অংশগ্রহণ ছিল সীমিত—ন্যাপের দুজন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র সদস্য নবেন্দ্র নারায়ণ লার্মা ছাড়া আর কেউ আলোচনায় সক্রিয় ছিলেন না।

অন্যদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় মোট ১২০ ক্যালেন্ডার দিনের সময়জুড়ে, ৪১ কার্যদিবসে আলোচনা করেছে। এতে অংশ নিয়েছে ৩০–৩৩টি রাজনৈতিক দল এবং গৃহীত হয়েছে ৮০টির বেশি ঐকমত্যের প্রস্তাব। আলোচনা হয়েছে প্রায় ৩৫০ ঘণ্টা। অর্থাৎ, আলোচনা ঘণ্টার হিসেবে ঐকমত্য কমিশন গণপরিষদের চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয়ভাবে বিতর্ক ও সংলাপ করেছে।

আলোচনার গভীরতা ও সময় ব্যাপ্তির দিক থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম ২০২৪-২০২৫ সালে ১৯৭২ সালের গণপরিষদের চেয়েও ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। একক দলীয় নিয়ন্ত্রণে গঠিত গণপরিষদের চেয়ে বহু রাজনৈতিক দলের উপস্থিতিতে পরিচালিত এই কমিশনের প্রক্রিয়া অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বমূলক।

সুতরাং, বর্তমান বাস্তবতায় নতুন কোনো গণপরিষদ নির্বাচনের প্রয়োজন নেই। বরং ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশগুলো রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করাই হবে সময়োপযোগী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত।

সুতরাং, বর্তমান বাস্তবতায় নতুন কোনো গণপরিষদ নির্বাচনের প্রয়োজন নেই। বরং ঐক্যমত কমিশনের সুপারিশগুলো রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করাই হবে সময়োপযোগী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত।

গণভোট নিয়ে এই বিতর্কও অহেতুক । সাধারণ সংসদে সংবিধান পাস হওয়ার পর গণভোট হয় এই মর্মে যে- সংসদে যা গৃহীত হয়েছে তাতে জনগণের সমর্থন আছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য। সুতরাং সংসদে সংবিধান অনুমোদনের আগে গণভোটের কোনো সুযোগ নেই।

এছাড়া অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধান সংশোধন বা পুনঃলিখনেরও কোনো সুযোগ নেই। যেসব সংস্কার সাধারণ আইনের সঙ্গে যুক্ত কেবল সেগুলোই অধ্যাদেশ আকারে জারি করা যেতে পারে এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সমঝোতা দলিলে স্বাক্ষর করতে পারে এই মর্মে যে তাদের দল সংসদে নির্বাচিত হলে এই অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাসে ভূমিকা পালন করবে।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন গণপরিষদ নির্বাচন করে অতীতের অভিজ্ঞতা পুনরাবৃত্তি না করে, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলসমূহের সমঝোতা দলিল এবং সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন-সংস্কার করা সময়োপযোগী ও কার্যকর। এটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করবে এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখবে।

সংবিধান বাতিলের প্রস্তাবে গণফোরাম, বামপন্থী দল এবং বিএনপিসহ অনেকেই আপত্তি জানিয়েছে। তাদের দাবি সংবিধান পুনর্লিখনের নয়, বরং সংশোধনের মাধ্যমে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা উচিত।এতে দেশের গণতন্ত্র ও জাতীয় সংহতি অক্ষুণ্ণ থাকবে।কিন্তু তা না করে এই সব অহেতুক বিতর্ক আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অনিশ্চিত করবে । আমাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না একটি সুষ্ঠু ভোটের আশায় দেশের মানুষ ১৬ বছর ধরে অপেক্ষা করছে । রাজনৈতিক দলগুলো এবং জুলাই অভ্যুত্থানের শক্তির এমন কিছু করা উচিত হবে না দেশে আবার নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যুগান্তরের সৌজন্যে


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ